FANDOM


আবদুল্লাহ আবু সায়ীদEdit

সাহিত্য সঙ্গীত চিত্রকলার মতো শিল্পগুলোর প্রধান নিরাপত্তা এখানে যে, এগুলোকে সময়ের ক্ষুধার্ত থাবা থেকে বাঁচিয়ে রাখার সহজ উপায় আছে। এ-সব শিল্পের মধ্যে মানুষের জীবিত হৃদয়, যৌবনের মত নিটোল রঙিন শরীরে ও শারীরিক সজীবতায় শতাব্দীর সজড় বার্ধক্য অমান্য করে বাঁচে। সাহিত্যকে জীবিত অক্ষরে, সঙ্গীতকে সাংকেতিক চিহ্নে, চিত্রকে আঁক-আঁচরের অমর ঘরে দীর্ঘায়ু দেয়া সম্ভব।

কিন্তু চলচ্চিত্র দীর্ঘায়ুবঞ্চিত, নানা কারণে। এক যুগের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকে পরের যুগের সাধারণ দর্শকের সুমুখে উপস্থাপিত করার খুব সহজ উপায় এখনো জানা যায় নি। চলচ্চিত্রের দৈহিক আধার যে-সব উপাদানে গঠিত, বৈজ্ঞানিক কারণে সে-সবের আয়ুষ্কাল বেশ কিছুটা সীমিত হওয়ায় শতাব্দী দূরের কথা, কয়েক দশকের জীবনকালও অল্প ছবির ভাগ্যে জোটে। [গত চল্লিশ বছরের প্রযুক্তির বিকাশের প্রেক্ষাপটে ব্যাপারটি এখন আর সত্য নয়- লেখক, পরবর্তীতে সংযুক্ত]

দ্বিতীয়ত, চলচ্চিত্রকে জড়িয়ে একটা বিরাট সমকালীনতার ব্যাপার আছে যা শ্রেষ্ঠতম চলচ্চিত্রকেও পরের যুগের আয়ু থেকে বঞ্চিত করে। এ-জন্যেই চলচ্চিত্রের দ্যুতি, বৈভব এবং সমকালীন ঔজ্জ্বল্য তুল্য হয়ে দাঁড়ায় সেই সুন্দরী শ্রেষ্ঠার জ্বালাময় যৌবনরাশির সঙ্গে, যার প্রথম যৌবনের ধ্বংসকারী রূপলাবণ্য পরবর্তী জীবনের প্রকট বৈকল্যের দ্বারা উপহাস্য। ফলে অধিকাংশ চলচ্চিত্রের অবস্থাই রবীন্দ্রনাথ বর্ণিত সেই দুর্দশাগ্রস্ত গ্রন্থের দুর্ভাগ্যে এসে দাঁড়ায়, যে গ্রন্থ এক সময় অভাবনীয় সৃষ্টি হিসেবে লোকসমাজে সম্মান পায়, বহু হাতে বিবর্তিত বহু কণ্ঠে উচ্চারিত এবং বহুরসনায় আলোচিত হয়, অথচ যার সম্বন্ধে পরের যুগের আগন্তুক মানুষেরা গভীর অনুধাবন সত্ত্বেও-

“… ভেবে নাহি পায় এই লেখা একদিন কোন গুণে করেছিল জয় সেদিনের অসংখ্য হৃদয়।”

বলতে চাই চলচ্চিত্র বহুলভাবে যুগের জিনিস- যুগের উদ্দেশ্যে ও জন্যে। ফলে যুগান্তরে তার রক্তাক্ত মৃত্যু প্রায় অপ্রতিরোধ্য। এই জন্যেই সাহিত্য সঙ্গীত বা চিত্রশিল্পের মতো চলচ্চিত্রে মহত্তম শিল্পকর্ম- ক্লাসিক- দুর্লভ। বহুযুগের সশ্রদ্ধ সমর্থনে লালিত, বর্ধিত ও অভ্রান্ত, ঢের শতাব্দীর পরীক্ষোত্তীর্ণ কোনো শ্রেষ্ঠতম শিল্পকীর্তি কোন ঈর্ষিত ভবিষ্যৎ পাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থাকা অমূলক নয়। তাছাড়া শতাব্দীবাহী অগন্য সহৃদয় অনুভব, বীক্ষণ ও প্রতিফলনে সমৃদ্ধ, কালান্তরের মানপ্রবাহের বিস্ময় শ্রদ্ধা ও অভিভূতিতে ঐশ্বর্যবান হয়ে লোকশ্রুত কোনো বৃক্ষের বৃদ্ধি চলচ্চিত্রের পক্ষে কঠিন। বললে হয়ত ভুল হবে না যে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রেরও প্রধান উপজীব্য সমকালীনতার আলো। ফলে, পরের যুগে, সমকাল-বর্জিত, তা অনেকাংশে জ্যোতিহীন হয়ে বৈভব হারাতে আরম্ভ করে। চলচ্চিত্রের আবেদন প্রধানত যুগসীমিত বলে অতীতের কোনো আলোড়নকারী শিল্পকীর্তিকে যেমন প্রায়শ আমরা আমাদের সুমুখে প্রদর্শিত হতে দেখি না, তেমনি আবার পরের যুগের দর্শকদের সামনে আমাদের যুগের শ্রেষ্ঠ চিত্রের প্রদর্শনও বিঘ্নিত। আমাদের জীবনের চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন প্রায়শই আমাদের জীবৎকালে নির্মিত চলচ্চিত্রের অসাধারণ স্রষ্টা পরবর্তীযুগে বেঁচে থাকেন রটিত লোকশ্রুতিতে, জনতার প্রবাদে কিংবা বিমুগ্ধ সমালোচকের সশ্রদ্ধ শব্দরাশির মধ্যে।

চলচ্চিত্রের পক্ষে সমকালকে অতিক্রম করতে না পারার আরো একটি কারণ আছে। মহৎ শিল্পের কাছে যা প্রত্যাশিত তা হল যে, তা প্রত্যক্ষ জীবনের সঙ্গে খানিকটা আব্রু বজায় রেখে চলে। উপস্থিত বাস্তবের রোমোশ অত্যাচার শিল্প থেকে সেই কমনীয় রহস্যকে বিস্রস্ত করে- সেই মধুর গোপনীয়তাকে- যার মনোরম আশ্চর্যের রাস্তায় বিবৃত বাস্তবকে অলৌকিক বিস্ময়ে শিউরে উঠতে দেখি। শিল্পে বাস্তবের অসঙ্কোচ বিবৃতি অযাচিত; আমরা প্রত্যক্ষের ইঙ্গিত আশ্রয় করে জীবনের বিস্মিত, সূক্ষ্ণ, অস্পষ্ট বোধসমূহের নিমগ্ন জগতে চলে যেতে চাই।

কিন্তু চলচ্চিত্রে, খানিকটা উপন্যাসের মতো, প্রত্যক্ষ বাস্তবের অত্যাচারী উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্তত, কবিতার জনহীন প্রতীকধর্মিতার ঘরে আটকে না গিয়ে যদি তাকে উপন্যাসের মতো জনবহুল রাস্তার বাসিন্দা হতে হয়। মনে রাখতে হবে চলচ্চিত্র মূলত দেখার জগৎ। খানিকটা শোনারও। এই জগৎ পুরোপুরি ইন্দ্রিয় নির্ভর। চলচ্চিত্রের পৃথিবী তাই স্পষ্ট ও নির্বস্ত্র। এজন্যে রহস্যময় শিল্পের জগৎ, যা প্রধানত অস্পষ্ট ও ইঙ্গিতময়- এখানে কৃপণ পরিসর মেনে নেয়। ধরা যাক সুদূর পাড়াগাঁর একটি দৃশ্য যার প্রকৃতিতে শীত বিদায় নিচ্ছে- খয়েরি ঘরবাড়ি, ধান কেটে-নেওয়া মাঠ খড়, শীত, শুকনো ডোবা, গোলপাতার ঘর, নোংরা রোগা প্যাকাটে মানুষ- এ-সব কোন ছবিতে দেখানো হলো। ছবিতে এই আনুপূর্বিক দৃশ্যটা যদি বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়ে সংগৃহীত হয়, তবে নিশ্চয়ই এমন কিছু হবে, যেখানে উপস্থিত প্রত্যক্ষের সরব চিৎকার দাঁত বের করে কল্পনা, প্রতীক ও অনুভবের জগতকে সংকুচিত করবে। দ্বিতীয়ত এই জীবন প্রকটভাবে প্রত্যক্ষ ও বাস্তব হওয়ায় এত বেশি যুগ ও সমকালীনতার শিকার হয়ে দাঁড়াবে যে পরের যুগের দর্শকদের ভিন্নতর রুচি ও বাস্তবতার সন্তুষ্ট জোগান দেওয়া তার পক্ষে খানিকটা কঠিনই হবে।

যে-কোন মহৎ শিল্প আসলে এক ধরণের সংকলন। বিবৃত জীবন থেকে শিল্প প্রয়োজনবোধে বেছে নেয়, সংগ্রহ করে, সংকলন করে; গ্রহণ করে সেটুকু, যেটুকু বিস্তৃত ও বিশদ জীবনের ইশারা শুধু- যে ইশারার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে জীবনের বাস্তব জীবনের সুবিশাল জগৎ। চলচ্চিত্রে জীবনের বাস্তবতার সংকলন সীমাবদ্ধ। চলচ্চিত্রের লিপিকার- ক্যামেরা- বাছাইয়ে অনেকটাই অপারগ। তার সর্বদর্শী, সর্বগামী, সর্ব আহরণকারী লোভী ও অক্ষম দৃষ্টি প্রত্যাখ্যানে পারঙ্মুখ। ফলে, চলচ্চিত্রের বাস্তব অনেকটাই জীবনের অসংকলিত বাস্তব। এই বাস্তব শিল্পের শত্রু; এ কারণে চলচ্চিত্রে জীবনের ইঙ্গিতময়তা সংকুচিত ও রহস্যের পদচারণা তুলনামূলকভাবে বিরল।

চলচ্চিত্রের বাস্তব প্রতীকী হয়ে ওঠার পথে বাধা পায় বলে এই বাস্তব স্বল্পায়ু। আজ থেকে ত্রিশ বছর আগের বাংলা চলচ্চিত্রের কথা ধরা যাক। যেখানে একজন বাস্তব যুবকের সৌখিন মধ্যবিত্ত চেহারা এরকম:

যে শান্তিপুরী ধুতি পরে, তার গায়ে গিলেকরা মিহি পাঞ্জাবি, কাঁধে গরদের চাদর, সে সযত্নকর্তিত গোঁফে যত্নবান, গায়ে গন্ধ মাখে, ধুতির কোঁচা পাঞ্জাবির পকেটে রাখতে উৎসাহী, সে মাথার মাঝ বরাবর সিঁথি কাটে, পায়ে ব্যতিক্রমহীন পাম্পসু চাপায় ও রুচিহীনভাবে (আমাদের চোখে) চুল কাটে। বলাবাহুল্য সেখানের সৌখিন যুবকের এই লোভনীয় বর্ণনা চল্লিশের যুগ পার হয়ে আমাদের যুগে আসার আগেই উদ্ভট ও হাস্যকর হয়ে গেছে। (অনুভব করা যায়, একালের কোনো উচ্ছ্বল বঙ্গললনা অন্তত সসাগ্রহে তার গলায় মালা পরাতে চাইবে না; বরং হয়ত আত্ম-অবমাননা অনুভব করবে। অথচ ঐ বাস্তব বর্ণনা এমন এক নায়কেন যে ছিল তার সময়কার সবচেয়ে আধুনিক, সবচেয়ে সুবেশ, সবচেয়ে মার্জিত, সবচেয়ে সুষম ও সুদর্শন; জনমনবন্দিত, আলোড়নকারী, প্রশংসিত এবং চটুল ললনাকুলের গোপন কামনার ঈর্ষাজনক মধ্যমণি।) সাহিত্যে? না, সাহিত্যে এমন হবার পথ নেই। চলচ্চিত্রের নায়কের মতো সাহিত্যের নায়ককে আমরা সবখানি দেখি না। সাহিত্যে তার খানিকটা দেখা যায়, বাকিটুকু আমাদের কল্পনার জিনিস। ফলে পরের যুগের নতুন পরিবেশে যখন আমাদের নায়কের ধারণা বদলে যায়, আমাদের মনের চাহিদা নতুন ধাঁচ ও চেহারার নতুন নায়ক খোঁজে, তখন আমরা অনায়াসে আমাদের মনের সেই পুরনো নায়ককে কিছুটা বদলে শুধরে নতুন করে নিতে পারি। ধরা যাক শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’। উপন্যাসটা জুড়ে দেবদাস নামের একজন নায়কের নান ক্রিয়াকলাপ রয়েছে। কিন্তু তাকে আমরা দেখতে পাই না। ফলে কল্পনায় তাকে তৈরি করে নিই। এ কারণে একজন মানুষ যখনই উপন্যাসটা পড়ে তখনই তার মনে একজন নতুন দেবদাসের জন্ম হয় যে অন্য পাঠকদের দেবদাস থেকে আলাদা। ফলে পৃথিবীতে যত মানুষ যতকাল এই উপন্যাস পড়বে, ততকাল ততগুলো দেবদাসের জন্ম হবে। যে ঠিক বাস্তবের নয়, কল্পনা দিয়ে যাকে আমরা তৈরি করেছি, কল্পনায় তাকে খানিকটা নতুন করে গড়ে তোলা কঠিন নয়। এইজন্যে তিরিশ বছর কিংবা তিরিশ হাজার বছর আগের সাহিত্যের নায়ক বা পাত্রপাত্রী আমাদের কাছে পুরনো হয় না। কিন্তু চলচ্চিত্রের নায়কের খুব অল্প অংশই আমাদের কল্পনার সম্পদ। সে এতবেশি বাস্তব প্রত্যক্ষ ও সুস্পষ্ট যে তার যুগ অবসিত হবার সঙ্গে সঙ্গে সে-ও অনেকটা আমাদের কাছে খানিকটা অবাঞ্ছিত হয়ে যায়। যায় এ জন্য যে এ নায়ক আমাদের মনের তৈরি নয়। আমাদের চোখের সামনে পরিচালকের চাপিয়ে দেয়া। আমাদের কল্পনার স্বাধীনতা সেখানে কম। পরের যুগের মানুষের পরিবর্তিত প্রত্যাশা তাই তাকে নতুন করে পায় না। ফলে এক যুগের জনপ্রিয়তম নায়ক তার অসামান্য দেহশ্রী, অনবদ্য কণ্ঠস্বর ও অলৌকিক অভিনয়ক্ষমতা নিয়েও পরের যুগের দর্শকদের কাছে অপরিচিত ঠেকে। এটা কেবল নায়ক নয়, প্রায় পুরো চলচ্চিত্র সম্বন্ধেই কমবেশি সত্যি। কিন্তু চিত্রশিল্পে? সাহিত্যে? সঙ্গীতে? এরা যেহেতু জীবনের বিশদ উপস্থাপন নয়- বরং মূলত ইঙ্গিত এবং প্রত্যক্ষের অনাবশ্যক বোঝায় আকণ্ঠ নয়- তাই বাস্তবের ব্যাপক অত্যাচারের কবলমুক্ত এদের নিরবলম্ব শরীর আক্রমণকারী সময়ের ঢেউ অনায়াসে পার হয়ে যায়।

এতগুলো কথা বলতে হল এজন্যে যে সম্প্রতি চলচ্চিত্রকে সাহিত্য, সঙ্গীত ও চিত্রশিল্পের পাশে স্থান দিয়ে সমমানের একটি মহৎ শিল্পমাধ্যম বলে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা চারদিকে চলছে।

খেদকর হলেও এ-কথা মেনে নেওয়া ভালো যে, কিছু কিছু শিল্প কিছু কিছু শিল্পের তুলনায় খানিকটা সীমাবদ্ধ। বাগ্মিতা কিংবা অভিনয় নিঃসন্দেহে শিল্প, অন্তত শিল্পপ্রতিভাসাপেক্ষ ব্যাপার। তবু সঙ্গীত কবিতা চিত্রশিল্প কিংবা নাট্য রচনার চাইতে এরা শিল্প হিসেবে দীন। কেন দীন, সে বিতর্কে যাওয়া এ মুহূর্তে অর্থহীন। এটা সবাই আমরা অনুভব করি। আসলে এই শিল্পগুলোর এমন কিছু সীমাবদ্ধতা আছে যার ফলে উপস্থিত বাস্তবতার উষ্ণ আঁচে তা আমাদের জীবনকে তাতিয়ে তুললেও কল্পনা এবং প্রতীকের জগতে এরা আমাদের পুরোপুরি মুক্তি দেয় না। চলচ্চিত্র- সঙ্গীত চিত্রশিল্প ও সাহিত্যের তুলনায়- কিছুটা বেশি সীমাবদ্ধতায় ভোগে বলেই মনে হয়।

Community content is available under CC-BY-SA unless otherwise noted.