FANDOM


লে কাত্র্ সঁ কু (ফরাসি ভাষায়: Les Quatre Cents Coups; ইংরেজি শিরোনাম: The 400 Blows) ১৯৫৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ফরাসি চলচ্চিত্র। ফ্রঁসোয়া ত্রুফো পরিচালিত এই সিনেমাটি নুভেল ভাগ তথা ফরাসি চলচ্চিত্রের নবতরঙ্গ আন্দোলনের সংজ্ঞা নির্ধারণকারী হিসেবে পরিচিত। এই আন্দোলনের বৈশিষ্ট্যময় অনেক কিছুই এতে পাওয়া যায়। অঁতোয়ান দোয়ানেল নামের প্যারিসের এক কিশোরকে কেন্দ্র করে এর কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। অঁতোয়ানের শিক্ষক ও অভিভাবক তাকে ঝামেলা সৃষ্টিকারী মনে করে। ফ্রঁসোয়া ত্রুফোর নিজের জীবনের অনুকরণে এটি নির্মিত হয়েছে যদিও জীবনীর সাথে কিছু কাল্পনিক উপাদানও ছিল। উল্লেখ্য, এটি ত্রুফোর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

ত্রুফো ও তাঁর এক বন্ধুর জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা এই সিনেমায় উঠে এসেছে। ফরাসি চলচ্চিত্রের ইতিহাস সম্বন্ধে ত্রুফোর ব্যক্তিগত অনুভূতিও এতে প্রকাশিত হয়েছে। ছবিটির একটি দৃশ্য জঁ ভিগো-র “জেরো দ্য কোঁদুইত” (Zéro de conduite) ছবি থেকে হুবহু অনুকরণ করা হয়েছে। ত্রুফো ছবিটি অঁদ্রে বাজাঁ-কে উৎসর্গ করেছেন। বাজাঁ ছিলেন ত্রুফোর আদর্শিক পিতা। ছবির দৃশ্যায়ন শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

চরিত্র নিয়ে নিবিড় অধ্যয়নের পাশাপাশি এতে ফ্রান্সে কিশোরদের প্রতি অবিচারের চিত্রটিও ফুটে উঠেছে। এর অনেকটা জুড়ে আছে কিশোর অপরাধীদের বিচার।

সিকুয়েল ছবিEdit

ত্রুফো অঁতোয়ান দোয়ানেলের জীবন নিয়ে আরও চারটি ছবি নির্মাণ করেছেন যার সবগুলোতেই অঁতোয়ান চরিত্রে অভিনয় করেছেন লেও। এগুলো অঁতোয়ানের পরবর্তী জীবনের বিভিন্ন ধাপ নিয়ে করা। যেমন, অঁতোয়ান এ কোলেত ছবিতে অঁতোয়ান কোলেত নামের এক মেয়ের প্রেমে পড়ে, যা ছিল তার প্রথম প্রেম। ১৯৬২ সালের “লাভ অ্যাট টুয়েন্টি” নামক চলচ্চিত্র সংগ্রহে ত্রুফোর এই ছবিটি স্থান পেয়েছিল। বেজে ভোলে ছবিতে অঁতোয়ান ক্রিস্তিন দার্‌বোঁ-র প্রেমে পড়ে। দোমিসিল কোঁজুগাল ছবিতে অঁতোয়ান ক্রিস্তিন-কে বিয়ে করে। কিন্তু লামুর অঁ ফুইত ছবিতে আবার তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

সত্যজিৎ রায়ের মতামতEdit

সত্যজিৎ রায় ফ্রঁসোয়া ত্রুফোর এই সিনেমার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তার “বিষয় চলচ্চিত্র” বইয়ের প্রথম প্রবন্ধ থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি:

আজ থেকে দশ বছর আগে ফরাসী পরিচালক ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো তার ছবি 4oo Blows-এর শেষ দৃশ্যের শেষ শট্‌-এ প্রথম freeze ব্যবহার করেন। এর আগে এই রীতি অন্য কোন ছবিতে ব্যবহার হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই, কিন্তু সে-ব্যবহার যে রসিকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি, একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে। ছবি করার আগে ত্রুফো ছিলেন ফ্রান্সের বিখ্যাত ফিল্ম পত্রিকা Cahiers du Cinema-র সমালোচক গোষ্ঠীর একজন। বহুকাল ধরে নানান দেশের ভালো-মন্দ ছবি দেখে, বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমালোচক Andre Bazin-এর সংস্পর্শে এসে ত্রুফোর বনিয়াদটা হয়েছিল পাকা। গোদার, শাব্রল, রিভেৎ ইত্যাদিও এই একই পরিবেশে তাঁদের চলচ্চিত্রশিক্ষা লাভ করেছিলেন। এই কয়েকজনের নেতৃত্বেই নিউ ওয়েভের সূচনা।

400 Blows-এর ভাষায় একটা চমৎকার সহজ সাবলীলতা আছে। ছবির প্রথম দিকে মাঝে মাঝে অন্যান্য বিখ্যাত ফরাসী পরিচালকের কথা মনে পড়ে যায়- যেমন রেনোয়া বা ক্লেয়ার বা বেকার। ছবির বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় এর দ্বিতীয়ার্ধে। এখানে ত্রুফো যে কেবল সিনেমার পূর্বপ্রচলিত রীতি থেকেই রসদ সংগ্রহ করেছেন তা নয়; টেলিভিশনের কিছু রীতিকেও তিনি কাজে লাগাচ্ছেন। ছবির প্রধান চরিত্র একটি দুরন্ত ডানপিটে ছেলে। তার দুরন্তপনায় নাজেহাল হয়ে তাকে তার বাবা-মা সংশোধনাগারে ভর্তি করে দিলেন। এখানে ছেলেটিকে জেরা করার একটি দৃশ্য আছে, যাতে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, ত্রুফো চিত্রনাট্য-নির্ভর মুখস্থ করা সংলাপ ব্যবহার করছেন না, দৃশ্যটি নেবার সময় ক্যামেরার সামনে তখন তখন বানিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, এবং ছেলেটি সরাসরি নিজের সাধ্য অনুযায়ী সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছে। ফলে ছেলেটির মুখে যে অভিব্যক্তিটি ফুটে বেরিয়েছে, সেটা সিনেমার প্রচলিত রীতিতে প্রায় অসম্ভব ছিল। ছেলেটির এই সংলাপের সঙ্গে কাহিনীর বিন্যাসের কোন যোগ নেই, বা যোগ থাকার প্রয়োজনও নেই। যে-সংলাপ ঘটনা বিন্যাসের কাজে ব্যবহার হবে, সে সংলাপ তৈরি-সংলাপ না হলে মুশকিল। কিন্তু ত্রুফোর এ-দৃশ্যে ছেলেটি নিজের কথা নিজের ভাষায় বলার ফলে সংলাপের একটি কর্তব্য- অর্থাৎ চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলা- চমৎকার ও অভিনব ভাবে পালন করেছে।

400 Blows-এর শেষ দৃশ্যে তাকে সংশোধনাগার থেকে পালিয়ে যেতে দেখানো হয়েছে। গ্রামের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে সে সমুদ্রের উদ্দেশে। সে শুনেছে স্কুলের কাছেই সমুদ্র আছে এবং তার ধারণা সমুদ্রে পৌঁছালেই তার সব সমস্যার শেষ হবে।

প্রায় চার মিনিটব্যাপী এই দৌড়ের দৃশ্য একটিমাত্র Tracking Shot-এ নেওয়া হয়েছে। সমুদ্রের কাছাকাছি পৌঁছালে পর শট পরিবর্তন হয়। এবার ছেলেটির সঙ্গে ক্যামেরা ‘প্যান’ করে (অর্থাৎ হাতল ধরে ঘুরিয়ে) দেখানো হয় সমুদ্রের ঢেউ যেখানে এসে আছড়ে পড়ছে, সেই পর্যন্ত এসে সে থেমে গেল। আর এগোনর পথ নেই। তাকে ফিরতে হবে। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে উলটোমুখে ঘুরে ছেলেটি এবার যেন আমাদের দিকেই (অর্থাৎ ক্যামেরার দিকে) দৌড়ে আসে। এইভাবে দর্শকদের দিকে চেয়ে দৌড়ানোর ভঙ্গীতে স্থির অবস্থাতেই ছবি শেষ হয়।

বোঝাই যাচ্ছে, এখানে freeze-এর ব্যবহার শুধু চমকপ্রদই নয়, গভীরভাবে অর্থপূর্ণ বটে- যাকে বলা হয় stroke of genius। ছেলেটির যাবার আর কোন পথ নেই। সুতরাং সে যতই ছুটুক না কেন, সেটা থেমে থাকারই সামিল। তার ছোটার ইচ্ছা এবং পরিচালকের ‘ছুটে লাভ নেই’ বলার ইচ্ছে একই সঙ্গে এই freeze-এ বলা হয়েছে। এখানে দর্শকদের দিকে চেয়ে থাকারও একটা মানে আছে। তবে মনে হয় যেন ছেলেটি বলতে চাইছে- তোমরাই- অর্থাৎ সমাজই আমার এই অসহায় অবস্থার জন্য দায়ী, তোমরাই ভেবে বার কর আমার মত ছেলের সমস্যা মিটবে কী করে।

Community content is available under CC-BY-SA unless otherwise noted.